• 66

‘ধর্মের সাথে ভাষার দ্বৈরথ নেই’

‘ধর্মের সাথে ভাষার দ্বৈরথ নেই’

মহান একুশে ফেব্রুয়ারিতে এফএম-৭৮৬’র নিয়মিত আয়োজন ‘নিউইয়র্ক ডায়েরি’-তে অতিথি হয়ে এসেছিলেন মুক্ত ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক  মাহমুদ রেজা চৌধুরী। কথা বলেছেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, প্রবাসে বাংলা চর্চাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে। 


আরজে আরিয়ান: কেমন আছেন? আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের শুভেচ্ছা।

মাহমুদ রেজা চৌধুরী: আমি ভালো আছি। আপনাকেও শুভেচ্ছা। 


শৈশবের দিনগুলোতে শহীদ দিবস কেমন দেখেছেন?

মাহমুদ রেজা চৌধুরী: আমার জন্ম বায়ান্ন’র অনেক পড়ে ১৯৫৭ সালে। আমরা থাকতাম আজিমপুরে। যখন আমার বোঝার মতো বয়স হয়েছে আমি দেখতাম প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি ভোর থেকে খালি পায়ে হাতে ফুল নিয়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’গানটা গাইতে গাইতে শহীদদের কবরে ফুল দিতো। আমি খুব কাছ থেকে এসব দেখেই বড় হয়েছি।


ভাষা আন্দলোনভিত্তিক লেখা তো খুবই কম...

আমি আপনার সাথে একমত। এটা খুব দুঃখজনক যে ভাষা আন্দোলন’র ৭০ বছর পরেও ভাষা আন্দোলনভিত্তিক সাহিত্য আমাদের খুবই কম। তবে বদরুদ্দিন উমর সাহেবের রাষ্ট্রভাষার ওপরে রচিত একটা বইতে আপনি দেখবেন জাস্টিস এলিস যিনি একজন ব্রিটিশ নাগরিক। পরবর্তীতে পুর্ব-পাকিস্তানের গভর্নরও ছিলেন ১৯৫৪ সালের কয়েকমাস । তিনি একটি রিপোর্ট-এ সেই সময়ের চিত্র তুলে ধরেছেন । আমাদের অবশ্যই উচিত ভাষা আন্দোলনভিত্তিক আরো বেশি সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করা। 


ভাষা আন্দোলনভিত্তিক কোন বইটা তরুণ প্রজন্মের পড়া উচিত?

বদরুদ্দিন উমর সাহেবের রাষ্ট্রভাষার ওপর রচিত বইটা আমাদের নতুন প্রজন্মসহ সকলেরই পড়া উচিত বলে আমি মনে করি। যারা ৫২ দেখেননি ৬৯ দেখেননি বা ৭৫ দেখেননি তাদের অবশ্যই এটা পড়া উচি্ত। ইতিহাস জানার জন্য এই বইটা খুব সহায়ক।


মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র ভাষণের সেই 'উক্তিটি' নিয়ে যদি কিছু বলতেন?

আসলে দেখুন এই ভাষণ বা সিদ্ধান্তটি তো অবশ্যই ভুল ছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কিন্তু কংগ্রেস করতেন ব্রিটিশদেরকে ভারতবর্ষ থেকে তাড়ানোর আন্দোলনে। পরবর্তীতে সময়ের প্রয়োজনে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সেই সময়ের অনেক বাঙালি নেতারাই কিন্তু মুসলিম লীগ করতেন। কারন তখন মুসলিমদের আলাদা একটা দেশের প্রয়োজন হয়েছিলো। দেশভাগের পর ভাষার প্রশ্নে আপনি দেখবেন জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্টভাষা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তখন পাকিস্তানের কোনো প্রদেশেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে উর্দু ভাষাভাষী ছিলো না । এটা অবশ্যই ভুল সিদ্ধান্ত বা শোষণের প্রথম ধাপ ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানের। 


বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন কতটা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধে? 

শুধু ধর্ম কিন্তু একটা রাষ্ট্রের মূল কাঠামো হতে পারেনা। আমাদের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানিদের ভাষার মিল ছিলোনা, সংস্কৃতির মিল ছিলোনা। কেবলি ছিলো ধর্মের মিল। বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনটা ছিলো কেবলি একটা ইস্যু নিয়ে।রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবি আর একাত্তর ছিলো আমাদের পাকিস্তান’র শাসনের নামে শোষণ আর অর্থনীতিসহ সকল বৈষম্য থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রয়াস। দুটোর প্রেক্ষাপট কিন্তু ভিন্ন ছিলো। তাই আমি মনে করি অবশ্যই বায়ান্ন’র প্রেরণা আছে একাত্তরে। তবে সেটাই একমাত্র নয়।


বাংলাকে বিশ্বমঞ্চে কতটা তুলতে পেরেছি, না পারলে দায় কার?

আমরা এটা এখনো বোধহয় অধিকাংশ বাঙালিই বুঝে উঠিনি ধর্মের সাথে ভাষার কোন দ্বৈরথ নাই। আমি মুসলমান হতে পারি, হিন্দু হতে পারি তবে আমি বাঙালি। আর স্রষ্টা সকল ভাষাই বোঝেন, তাকে যে কেউ যে কোনো নামে ডাকলেই কিন্তু তিনি শুনবেন। এটা খুবই লজ্জাজনক যে ভাষার মাঝেও আমরা ধর্মে এনে নিজেদের মাঝেই দেয়াল সৃষ্টি করি। অনেক বিদেশিরাও কিন্তু বাংলা শিখছে আপনি দেখবেন। তবে ভাষা আন্দোলনের এখনো প্রায় ৭০ বছর পরেও আমরা সেই ভাবে বাংলাকে তুলে ধরতে পারিনি । এই ব্যর্থতাই বলি বা দায়ভারই বলি এটা অবশ্যই আমাদের। আর একটা বিষয় আপনি দেখবেন অর্থনীতি একটা বড় বিষয় যে কোনো দেশের ভাষা বা সংস্কৃতির প্রভাব অন্য দেশের ওপর ফেলতে হলে। যেমন দেখুন চীন, জাপান এরা কিন্তু অর্থনীতি্র প্রভাব বিস্তারের মধ্য দিয়েই কিন্তু নিজেদের ভাষা তুলে ধরেন বিশ্বমঞ্চে। তাই আমাদের অর্থনেতিক প্রভাবের সাথে সাথে ভাষার প্রভাব বাড়ানো সম্ভব বলে আমি মনে করি।


এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কাউকে যদি কিছু বলতে চান?

মাহমুদ রেজা চৌধুরী: আমার আসলে নিজেকেই বলার আছে। আমি নিজেকে প্রতিনিয়ত এটাই বলি আমি যেন কখনো ভুল বা অন্যায়ের সাথে আপোষ না করি।

আপনার মতামত লিখুন :