• 690

রোহিঙ্গাদের নিয়ে অসাধারন কাজ করছে বাসমাহ

রোহিঙ্গাদের নিয়ে অসাধারন কাজ করছে বাসমাহ

এন্যুয়াল ফান্ডরেইজিং অনুষ্ঠিত

“রোহিঙ্গাদের বাঁচাতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন” এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানব কল্যাণে কাজ করা সংগঠন ‘বাংলাদেশ আমেরিকান সোসাইটি অব মুসলিম এইড ফর হিউম্যানিটি’ (BASMAH) বাসমাহ রোহিঙ্গাদের সহায়তায় বার্ষিক তহবিল সংগ্রহ ২০২০ এর জন্য একটি অনলাইন ইভেন্টের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটি গত ৫ ডিসেম্বর শনিবার ইউটিউব, ফেসবুক ও টিভি চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়। এতে বিশ্বের বেশকিছু ইসলামিক স্কলার ‘ইসলামে মানব কল্যাণ মূলক কাজের গুরুত্ব ও এক্ষেত্রে বাসমাহ’র ভূমিকা’ বিষয়ে আলোচনা পেশ করেন।


শায়েখ আবদুর রউফ আল খাওয়ালদেহ এর সঞ্চালনায় চলা এ অনুষ্ঠানটি শুরু হয় শায়েখ ক্বারী মোহাম্মদ জাহিদের কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। এরপর এতে বক্তব্য রাখেন, ইমাম খালেদ লতিফ, ইমাম সিরাজ ওহাজ, শায়েখ মানজের তালিব, ড. মাহমুদ আল হাদিদী, মুফতি সুলতান, মাওলানা রওশন আলী, মুফতি ইজহার খান, ইমাম জাকির আহমদ প্রমূখ।


বক্তব্যে মুফতি ইজহার খান বলেন, ‘অসহায় ও দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম। ইসলাম এক্ষেত্রে মানুষকে ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করে। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেশকিছু হাদিসের মধ্যে একাজের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ যে ব্যক্তি বেশি বেশি সালাম দেয়, অসহায় ও দুঃখী মানুষকে অন্য দেয়, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখে এবং শেষ রাতে সালাত আদায় করে; সে অতি সহজেই জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ তাই মানবকল্যাণমূলক কাজ মানুষের জীবন প্রদান লক্ষ্য হওয়া ‍উচিৎ।’


তিনি আরো বলেন, ‘ইসলামের এ মহান উদ্যোগকে সমাজে বাস্তবায়ন করতে ‘বাংলাদেশ আমেরিকান সোসাইটি অব মুসলিম এইড ফর হিউম্যানিটি’ (BASMAH) বাসমাহ দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। যেখানেই অসহায় সেখানেই যেন বাসমাহ। তাই সমাজের বিত্তবান মানুষের উচিৎ এ কাজে বাসমাহর সঙ্গী হওয়া, রোহিঙ্গাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসা এবং জান্নাতের পথকে সুগম করা। কেননা বাসমাহ অসহায়ের সহায়, গরিবের আশার আলো, উদ্বাস্তুদের মাথা গোাঁজর ঠাঁই।’ 


ইমাম জাকির আহমদ তার বক্তব্যে বলেন, ‘আজ নিজেকে অনেক সম্মানজনক একজন মানুষ মনে হচ্ছে। কেননা আজ আমি এমন কিছু মানুষের জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজে সহযোগী হতে পেরেছি; যারা মানবিক মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। যারা বছরের পর বছর ধরে নির্যাতিত নিপিড়িত। আর এটা এখন লুকানোর মতো কিছু নয়। পৃথিবীর সব মানুষই রোহিঙ্গাদের ওপর চলা নির্যাতনের কথা জানে।’


তিনি আরো বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই মীর হোসাইন ভাই ও পুরো বাসমাহ টিমকে। যারা অক্লন্ত পরিশ্রম করে এ কাজটি করে যাচ্ছে। সময়ের কথা ধরলে মনে হয় বাসমাহ এই সেদিন পথচলা শুরু করেছে। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ তাদের কাজের অপরিসীম গতি  ও একনিষ্ঠতার কারণে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে এটি পুরো বিশ্বকে প্রভাবিত করছে। তাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকার পরও এটি তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। বিশেষ করে রুহিঙ্গাদের জন্য তাদের পরিশ্রমের কোনো তুলনা হয় না। রুহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের সহযোগিতার হাত বাড়ানোর ভিডিওগুলো মানুষকে প্রভাবিত করার মতো। তাদের কাজের মাঝে যেন নববী প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠছে।  আমাদের উচিৎ বাসমাহর সহযোগী হয়ে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো। অসহায় এ  সম্প্রদায় কিছুটা সহযোগিতা পেলে রঙ্গিন না হোক অন্তত জীবনের সাদাকালো সুখের ছোঁঁয়া পাবে।’


ড. মাহমুদ আল হাদিদী তার বক্তব্যে বলেন, ‘আমি এমন একটি কাজের সঙ্গে থাকতে পেরে গর্বিত। আসলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় নিগৃহিত জনগোষ্ঠি মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের কথা আমরা এখন প্রায় ভুলতে বসেছি। আমার যখন এ কথা মনে হয় যে, একটি জনগোষ্ঠী শুধুমাত্র মুসলমান হওয়ার কারণে বাস্তুভিটা হারাচ্ছে। নির্যাতিত হচ্ছে; তখন একজন মানুষ হিসেবে মানবতার জায়গা থেকে অন্তরে রক্ত ক্ষরণ হয়। কষ্ট পাই। প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলি। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিজেদের সর্বস্ব হারিয়ে এখন মানবেতর জীবন-যাপন করছে। আমার আপনার একটু সহযোগিতা তাদের আশার আলো হতে পারে। হতে পারে বেঁচে থাকার সর্বশেষ অনুপ্রেরণা। তাই তাদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন।’


ইমাম খালেদ লতিফ বলেন, ’আমি দুই দুই বার বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়েছি। তাদের মানবেতর জীবন যাপন আমাকে খুব ব্যথিত করেছে। আমি বেশকিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের নিজের মুখ থেকে শুনেছি তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের কথা। তাদের মধ্যে কেউ ছিল আলেম, কেউ হাফেজে কুরআন। তারা বলছিল, ‘আমাদের চোখের সামনে আমাদের মা-বাবা, ভাইবোন, স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয়স্বজনদের পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। গবাদি পশুগুলোকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভষ্ম করে দেয়া হয়েছে ঘরবাড়ি। আমরা যারা কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে ছিলাম, তাদের কেউ টানা একসপ্তাহ, কেউ পাঁচ দিন, কেউ তিনদিন পায়ে হেঁটে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিই।’


‘আমার জানা মতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার পর থেকেই বাসমাহ তাদের সহযোগিতায় কাজ করছে। আমি নিজ চোখেও তা প্রত্যক্ষ করেছি। তবে তাদেরও তো একটা আর্থিক পরিসীমা আছে। তারা যদি আরো আর্থিক সহযোগিতা আমাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারতো; তাহলে তাদের সেবামূলক এ কাজ আরো সমৃদ্ধ হতো। তাই আসুন আমরা বাসমাহর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াই।’


ইমাম সিরাজ ওহাজ বলেন, ‘বাসমাহর নামটা যখন আমি প্রথম শুনি; তখন এর নামটা আমার হৃদয়ে স্পর্শ করে। কারণ আমার কলিজার ‍টুকরো মেয়ের নামও এটি। আসলে বাসমাহর কর্মপদ্ধতি ও পদক্ষেপগুলোর প্রশংসা করতে হয়ে। তারা এতো অল্প সময়ে বিরাট একটি জনগোষ্ঠীর মুখে হাসি ফোটাতে সক্ষম হয়েছে। এর মাধ্যমে বাসমাহ তার নামের সার্থকতা বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পেরেছে। আমরা যদি বাসমাহর এ অনন্যকাজে সহযোগী হতে পারি তাহলে আমরা মানুষ হিসেবে নিজেদের সার্থক মনে করতে পারবো। তাই আসুন বাসমাহর পথসঙ্গী হই। ’


শায়েখ মোনজের তালেব বলেন, ‘কোভিড-১৯ আমাদের জীবনকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক, আন্তর্জাতিক সব পরিকল্পনা পরিবর্তন করে দিয়েছে। পরিবর্তন করে দিয়েছে সবকিছু । আমাদের টাকা আছে, থাকার জায়গা আছে, দোকানে খাবার আছে। এরপরও কোভিড-১৯ আমাদের সবকিছু অচল দিয়েছে। পুরো দুনিয়া আমাদের হাতের মুঠোয়, তবুও আমরা অদৃশ্য এক জীবাণুর সঙ্গে পেরে উঠিছি না। এ থেকে আমাদের রক্ষা পেতে হলে প্রকৃত মুমিনদের কাতারে শামিল হতে হবে। নবী করিম সা. এর দেখানো পথে হাঁটতে হবে। নবী করিম সা. বলেন, সাদাকাহ মানুষকে বিপদ-আপদ থেকে দূরে রাখে। তাই আমরা যদি এ মহামারী থেকে বাঁচতে চাই, তাহলে সাদাকার বিকল্প নাই। তাই আমি সবার কাছে আহ্বান করবো, আপনারা নিপিড়িত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের জন্য সাদাকাহ করুণ। আপনাদের সাদাকাহ বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাদের কাছে পৌঁছে দেবে বাসমাহ।’


বাসমাহ’র সিও মীর হোসাইন বলেন, ‘আমি কথা বলছি ১.৩ মিলিয়ন সম্প্রদায়কে নিয়ে; যারা একটু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে চায়। সুস্থভাবে বাঁচার অধিকার চায়। বাসমাহ তাদের সহযোগিতায় কাজ করছে। তাদের একটু বেঁচে থাকার জন্য আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। বাসমাহ আমেরিকা থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তাদের কাছে তা পৌছে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’


উল্লেখ্য ‘বাংলাদেশ আমেরিকান সোসাইটি অব মুসলিম এইড ফর হিউম্যানিটি’ (BASMAH) একটি অরাজনৈতিক এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি সরকারী অনুমোধনপ্রাপ্ত তাদের বাংলাদেশ শাখা বাসমাহ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এর তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সেই শুরু থেকেই পাশে দাঁড়িয়েছে।


বাসমাহ তাদের শিক্ষা, খাদ্য,ঔষধ, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে নিরলসভাবে কাজ করছে।রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের তৈরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ বাচ্চা অক্ষর জ্ঞান নিচ্ছে। বাচ্চাদের প্রদান করা হচ্ছে শিক্ষামূলক উপকরণ, জামাকাপড় এবং ব্যাগ । সেখানে তৈরি বাসমাহ’র মেডিকেল সেন্টারে সপ্তাহে প্রায় ৭০০ রোগি সেবা গ্রহণ করছে। এছাড়াও বাসমাহ সেখানে ব্যবস্থা করেছে বিশুদ্ধ পানির জন্য গভীর নলকূপ, শীতবস্ত্র, রান্নার হাঁড়ি, মশারি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের।

আপনার মতামত লিখুন :