• 160

‘পায়ে গুলি লাগলেও সেটা ছিল তুচ্ছ’

‘পায়ে গুলি লাগলেও সেটা ছিল তুচ্ছ’

এফএম-৭৮৬ এর বিশেষ আয়োজন ‘আমার মুক্তিযুদ্ধ’। আমেরিকায় বসবাসরত মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকথা তুলে ধরাই এই অনুষ্ঠানের লক্ষ্য। এই পর্বে যুক্ত হয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল উদ্দিন সাঈদ (মোহন) মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জগন্নাথ কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন তিনি।


আপনার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা কোথায়?

কামাল উদ্দিন সাঈদ মোহন: আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে। আমার প্রয়াত পিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর ছিলেন তিনি। দু-একটা হলে প্রভোস্ট ও ছিলেন। আমরা সাত ভাইবোন। আমি ছিলাম মাঝামাঝির দিকে। তার মধ্যে আমার দুই বোন মারা গেছে। এখন আমরা দুটি বোন তিন ভাই বেঁচে আছি। 

আমার গ্রামের বাড়ি সোনারগাঁয়ের গোবিন্দপুর গ্রামে। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে আমেরিকার স্পেশালাইজড ডিপার্টমেন্টের ক্যাপ্টেন, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ালেখা করেছে। ছোটছেলেও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার  সেও ন্যাশনাল গার্ডে আছে।


আপনার পরিবারে আর কেউ মুক্তিযোদ্ধা আছে? 

এই কথার উত্তর আমার দৃষ্টিতে ব্যাপক। কেউ একজন সমর মুক্তিযোদ্ধা হতে পারে আবার একজন সংগঠকও মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেন। যুদ্ধের সময় আমরা একটা বাড়িতে আশ্রিত ছিলাম। আমার সহযোদ্ধার মা সবসময় জায়নামাজে বসে দোয়া করতেন, যেন আমরা সবাই সুস্থভাবে ফিরে আসতে পারি। একটা কথা বললে কেমন শোনা যাবে জানি না, তখন টোকাই ছেলেদের দিয়ে আমরা খবর  দেয়া-নেয়া করতাম। তারা আমাদের ইনফর্মার ছিল। বয়স অনেক কম ছিল, মাত্র ৮-১০ বছর কিন্তু তারাও কোনো না কোনোভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। এদিক থেকে বলা যায়, তারাও মুক্তিযোদ্ধা। যে মহিলা আমাকে খাইয়েছেন, আশ্রয় দিয়েছেন তারাই আসল মুক্তিযোদ্ধা। এই হিসেবে আমার পরিবারের সবাই কমবেশি মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত ছিল। 


মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার বয়স কত ছিল? 

একাত্তরে আমি জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। রাজনৈতিক কারণে ঢাকা কলেজ থেকে বের করে দেওয়ার পর জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হই। সেখানে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। মনে পড়ছে আরো আগের কথা। বাবাকে দেখেছি, তিনি ভাষা আন্দোলনের সংগ্রাম কমিটির আহŸায়ক ছিলেন। তমুদ্দিন মজলিস থেকে যখন সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক নির্বাচন হয় তখন তিনি সেই কমিটির মেম্বার ছিলেন। পরে প্রথম রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সংগ্রাম কমিটির  আহবায়ক হন। এক সময় তারই একজন ছাত্র সিরাজুল আলম খান আমাকে রাজনীতিতে নিয়ে আসেন ছোটবেলাতেই। আমাদের সাথে যারা সহযোদ্ধা ছিলেন তারা এখন অনেকেই পরবাসী। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক  হওয়ার পর ছাত্রলীগের মধ্যে দুটি ভাগ হয়েছিল। আমি জগন্নাথ কলেজে ইউডিসি হিসেবে কাজ করি অর্থাৎ একটি আর্মি ট্রেইনি হিসেবে কাজ করছিলাম। এটা ছিল ৭১-এর প্রথম দিকের কথা, তখন  আমাকে বলা হয়েছিল আর্মি ট্রেনিং দেওয়ার কথা। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন খসরু এবং মন্টু ভাই। 

মন্টু ভাই ছিলেন তখন যুবলীগের প্রেসিডেন্ট। আমি এদিকে ট্রেইন আপ থাকার কারণে খসরু ভাই আমাকে সকল ছেলেমেয়েদের ট্রেনিং করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এটি ছিল মার্চের আগের কথা। স্থানটি ছিল পলাশীর মাঠ। সেখানে মাইন অপারেশন এর ট্রেনিং আমরা দিয়েছি।

তারপর একটা সময় ইউনিভার্সিটিতে আমাদের পতাকার সোনালী রঙ আমিই এনে দিয়েছিলাম যেটা দিয়ে রং করে সেই পতাকা ৩মার্চ কলাভবনে টানানো হয়। ২৩ মার্চের ঢাকা পল্টনে একটি মার্চ পাস হয়, সাতটি গ্রুপ করা হয়। তখন খসরু ভাই আমাকে বলেন, আমি যেন শেষের দিকের গ্রুপে লিডার  হই। সেখানে আমাদেরকে সশস্ত্র অভিবাদন দেয়া হয় সেখানে আমাদের পতাকা উত্তোলন করা হয়।


মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে আপনাদের কর্মকাণ্ড জানতে চাই

মার্চের ১৫ তারিখের দিকে খসরু ভাই আমাদেরকে বললেন, একটা জায়গায় যেতে হবে কিন্তু আমরা কেউই জানতাম না কোথায় যাচ্ছি, সেটা আমাদেরকে বলেননি। আমাদেরকে নিয়ে গেলেন গাজীপুর অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরিতে, যেটি ছিল একটি আর্মস ফ্যাক্টরি। সেখানে গেট বন্ধ থাকায় আমিই প্রথম দেয়াল টপকে ঢুকে লোহার রড দিয়ে তালা ভাঙি তারপর সবাই ভেতরে ঢুকলো। ঢোকার পর আমাদের যত ধরনের অস্ত্র দরকার আমরা সব সেখান থেকে নিয়ে আসি


তারপর ২৫ মার্চে কী করলেন?

২৫ মার্চে যখন গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছিলাম তখন আমরা জানতে পারলাম যে আর্মিরা সন্ধ্যার দিকে বের হয়েছে। আমরা শেখ সাহেবের বাসায় গেলাম। আমরা ১০ থেকে ১২ জনের মতো ছিলাম, আমরা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি বিষয়টি। তৎকালীন আওয়ামী লীগ এর অনেকেই চাচ্ছিলেন না মুক্তিযুদ্ধ হোক। তারপরে আমরা সেখান থেকে ফিরে আসি, সময় ছিল তখন রাত ১০টা। ২৬ শে মার্চ সকালে ডিক্লেয়ারেশন আসে স্বাধীনতা যুদ্ধের। ঘোষণায় বলা হয় ‘ওয়ার অফ ইন্ডেপেনডেন্স’।


যুদ্ধের কোনো বিষয়টা ছিল খুব দুঃখের?

এটা বলতে গেলে, শুরুতেই বাবার কথা গুলো খুব মনে পড়ে যায়। তখন আমার ক্যাম্প ছিল কেরানীগঞ্জে মন্টু ভাইয়ের সাথে। আমরা দুইভাবে যুদ্ধ করতাম একটা গেরিলা পদ্ধতিতে আরেকটি সম্মুখ যুদ্ধে। পাকিস্তানি আর্মিরা তখন তাদের আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিলো, অনেক গ্রাম বাড়ি ধ্বংস করে দিয়েছিল। তখন আমাদেরকে তিনটা গ্রুপে ভাগ করে দেওয়া হলো। একটি মন্টু ভাইয়ের, একটি আমার গ্রুপ আরেকটি রহিম ভাইয়ের গ্রুপ। আমি তখন এলএনজি চালাতাম। 

এলএনজি ম্যাগাজিন চালাতে একজন লোক লাগতো তার নাম ছিল আকরাম। যুদ্ধ করতে করতে যখন আমরা পাকিস্তানিদের মাঝখানে নিয়ে আসি তখন পিছন থেকে আমরা আক্রমণাত্মকভাবে তাদেরকে গুলি করতে থাকি। একটা সময় ৩০০ রাউন্ড গুলি করার পর যখন আমাদের চ্যানেলটা গরম হয়ে যায়, ঠান্ডা করার জন্য কিছু দরকার ছিলো। অন্ধকারে হাতড়ে কিছু না পেয়ে, নিচু স্বরে ডেকেও কারো সাড়া না পেয়ে হাতের কাছে কাদা মাটি পেয়ে তা দিয়েই ঠান্ডা করার কাজটা সারলাম। 

যখন ফজরের আজান দিয়ে দিয়েছে, সকাল হয়ে গেলো তখন আমরা ১০০ জনের মতো পাকিস্তানিদের হত্যা করতে সফল হই। তারপর আমাদেরকে বলা হলো, আপনাদের টিম মেম্বারদের আলাদা করুন। দেখতে পেলাম সবাই আছে আকরাম নেই। তারপরে পাশেই টিলার মতো একটা জায়গায় দেখলাম, ওর মাথার খুলি উড়ে গেছে। পরে আমি উপলব্ধি করলাম, আমি ঠান্ডা করার কাজে কাদা মাটি ভেবে যা নিয়েছিলাম সেটা আর কিছুই ছিল না সেটি ছিল আকরামের রক্তমাখা মগজ!


যুদ্ধ চলাকালীন আপরি কোনো শারীরিক আঘাত পেয়েছিলেন?

হ্যাঁ, আমার পায়ে গুলি ঢুকে এপাশ থেকে ওপাশ হয়ে বের হয়েছিলো। তবে সেই আঘাত তখন তুচ্ছ মনে হয়েছিলো।


বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নিয়ে কিছু বলুন। আপনার বাবাও তো একজন প্রফেসর ছিলেন, তার ওপর কোনো আঘাত এসেছে?

পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্য ছিলো এদেশ কে মেধা শূন্য করে দেওয়া। অনেক শিক্ষক, চিকিৎসক, কবি, সাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক এমন অনেককেই তারা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। আমার বাবাকেও মেরে ফেলার জন্য আলবদর বাহিনী থেকে অনেকেই চিঠি পাঠাচ্ছিল। তখন আমি জানতে পেরে উনাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দিয়েছিলাম। 


দেশ নিয়ে আপনার যে স্বপ্ন ছিলো তার কতটুকু পূরণ হয়েছে?

সত্যি বলতে কী, আমি আশাহত। আমাদের স্বপ্নগুলো বাস্তব না হয়ে জমে গেছে। নতুন প্রজন্মের অনেক কিছু দেওয়ার আছে এদেশকে। এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। আমি চাই তাদের হাত ধরেই স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে উঠুক।

আপনার মতামত লিখুন :