• 857

মূর্তি হোক কিংবা ভাস্কর্য, দুটিই স্পষ্ট হারাম

মূর্তি হোক কিংবা ভাস্কর্য, দুটিই স্পষ্ট হারাম

বাংলাদেশে এবং প্রবাসে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় মূর্তি ও ভাস্কর্য। নানা বিতর্কের কারণে এ নিয়ে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসলমানরাও বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। এসব বিভ্রান্তি দূর করতে ‘মূর্তি ও ভাস্কর্য : ইসলামি দৃষ্টিকোণ’ এই শিরোনামে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে আইটিভি ইউএসএ। পরিচালনা করেন ইউনাইটেড ইমাম উলামা কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট মাওলানা রফিক আহমদ রেফাহি। অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরের ইসলামিক স্কলাররা এ বিষয়ে তাদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। এখানে সেসব মতামতের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-


মুফতি আবদুল মালেক, খতিব মসজিদ বেলাল

পবিত্র কোরআন এবং হাদিস তো বটেই, দুনিয়ার সব আলেমরাও একমত যে, ইসলামে মূর্তি কিংবা ভাস্কর্য হারাম। ক্ষেত্রবিশেষে এটা শিরক, যা ভয়াবহ অপরাধ। সমস্ত সাহাবি, চার খলিফা, তাবে-তাবেঈন এবং এ যুগের বিশেষজ্ঞ আলেমদের কেউই এর পক্ষে মত দেননি। মুসলিম শরীফের হাদিসে এসেছে, আবুল হাইয়ায আল-আসাদী (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আলী (রা.) আমাকে পাঠালেন এবং বললেন, আমি কি তোমাকে এমন কাজে প্রেরণ করবো যে কাজে আমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) পাঠিয়েছিলেন? সেই কাজ হলো- আমি যেন কোনো উঁচু কবর দেখলে তা সমতল এবং কোনো মূর্তি দেখলে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিই।


মুফতি লুৎফর রহমান কাসেমী, সেক্রেটারী আসসাফা মসজিদ

এ নিয়ে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকার কথা নয়। পবিত্র কোরআনের ভাষায় এটা স্পষ্টতই হারাম। সোজা কথা হলো, মদ যেমন হারাম, জুয়া যেমন হারাম, মূর্তি কিংবা ভাস্কর্য বানানোও তেমন একটি হারাম কাজ। শরীয়তে এটাকে শয়তানের কাজ বলা হয়েছে। রাসূল (সা.) বিদায় হজের ভাষণে আমাদেরকে দুটি জিনিশ আকড়ে ধরতে বলেছেন, একটি কোরআন অপরটি সুন্নাহ। এই দুই জায়গা থেকেই মূর্তি এবং ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে অকাট্ট দলিল পাওয়া যায়। সুতরাং এর পক্ষে বলার কোনো সুযোগ নেই।  


মাওলানা মীর্জ া আবু জাফর বেগ, ইমাম, জামাইকা মুসলিম সেন্টার

যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ নিয়ে বিতর্কটি সামনে এসেছে, তিনি একজন মুসলমান ছিলেন। তার জীবনী থেকে ইসলাম এবং মুসলমানদের প্রতি তার দরদের কথা পড়েছি। তিনি তাবলীগের জন্য জমি দান করেছিলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। ইসলামের জন্য তার আরও অনেক খেদমতের কথা আমরা জানি। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে বলতে চাই, এমন কাজ কেন করবেন, যার জন্য আপনার বাবা কষ্ট পাবে? আপনি অনুধাবন করুন, বঙ্গবন্ধু শুধু আপনার পিতা নন, বাংলাদেশের স্থপতি। আমরা বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে এখানে এসেছি। তাই আমাদের দেশের মরহুম স্থপতির ব্যাপারে আমরাও মতামত দেওয়ার অধিকার রাখি।   


মাওলানা আজির উদ্দিন, বাইতুল আমান মসজিদ

অনেকেই ব্যাখ্যা করছে, মূর্তি আর ভাস্কর্য এক নয়। এটা মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়। এর শব্দগত বা অর্থগত পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু শরীয়তের বিধানে দুটিই সুস্পষ্ট হারাম। উপসনার জন্য বানানো হোক কিংবা স্মৃতির জন্য, এটাকে হালাল বলার কোনো সুযোগ নেই। আরেকটা বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, অনেকে মনে করেন, আমরা শুধু বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতা করছি। আসলে তা নয়। মূর্তি হারাম, সেটা যে কারোই হোক না কেন? যদি কোনো নবীর মূর্তিও হয় তাহলে সেটা ভেঙে ফেলতে হবে। এই মূর্তি কিংবা ভাস্কর্য যারা বানাবে, তাদের ঠিকানা জাহান্নাম।


মুফতি মুহাম্মদ ইসমাঈল, আন নুর কালচারাল সেন্টার

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, হাইকোর্টের সামনে স্থাপন করা একটি মূর্তি নিয়ে বাংলাদেশে অনেক বিতর্ক হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ওই মূর্তির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তাই যারা বলে, আলেমরা বঙ্গবন্ধুকে টার্গেট করে মূর্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যাচার করছেন। মোদ্দাকথা হলো এটা হারাম, এবার মানা না মানা সম্পূর্ণ আপনার ব্যাপার। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী কিংবা কোনো ব্যক্তিকে খুশি করার জন্য হারামকে হালাল বলতে হবে কেন? আলেম-ওলামাদের কেউ কেউ যদি এর পক্ষে বলে থাকেন তাহলে স্পষ্টভাবে গুনাহের কাজ করছেন।   


মাওলানা জাকারিয়া মাহমুদ, বাইতুশ শরফ মসজিদ

যারা মূর্তি-ভাস্কর্য বানায় কোরআন হাদিসে তাদের ব্যাপারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। হাদিসে এসেছে, যারা এটা নির্মাণ করবে তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অভিশাপ। হাদিসে আরও এসেছে, কেয়ামতের দিন যাদেরকে সবচেয়ে বেশি আজাব দেওয়া হবে তাদের মধ্যে থাকবে মূর্তি তৈরি করা এসব নির্মাতারা। কেয়ামতের দিন এসব নির্মাতাদের উদ্দেশে আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি যা তৈরি করেছো, তাতে প্রাণ দাও। কিন্তু সে তো প্রাণ দিতে পারবে না। তখন তার এই অক্ষমতার জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।  


মাওলানা আবদুল মুকিত, দারুসসালাম মসজিদ

একজন আলেমের দায়িত্ব কি, এটা বোধহয় অনেকেই ভুলে যায়। যে কোনো সঙ্কটে একজন আলেম কোরআন-হাদিসের আলোকে সমাধান পেশ করবেন, এটাই তার কাজ। আমাদের হাতে আল্লাহ তায়ালা বাতি (আল কোরআন) তুলে দিয়েছেন, আমাদের কাজ হবে সেই বাতি দ্বারা অন্ধজনে (যিনি অজ্ঞ) আলো দেখানো। আমরা যদি সেটা না করি তাহলে কেয়ামতের ময়দানে এর দায় নিতে হবে। সেই দায়বোধ থেকেই মাওলানা মামুনুল হক কিংবা অন্যান্যরা ভাস্কর্যের ব্যাপারে ফতোয়া দিয়েছেন। এটা নিয়ে গোস্বা হওয়ার কিছু নেই। কারণ তারা তো ঠিক দায়িত্বটাই পালন করেছেন। এর জন্য তাদের ঘাড় মটকে দেওয়া হবে, তাদেরকে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়া হবে-এসব বলা ঠিক নয়। মনে রাখতে হবে, আলেমরা কারো দুশমন নন।   


মাওলানা তাজ উদ্দীন, দারুল উলুম মিশিগান

প্রথমেই আমি বলতে চাই, এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা আলোচনা। তাই সবাই এই আলোচনাটাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করবেন। হক কথা বলতে গিয়ে কাউকে ভয় পাওয়া চলবে না। শরীয়তের কথা বললে যদি কারো গায়ে লাগে তাহলে আমাদের কিছু করার নেই। মনে রাখতে, হক কথা বলতে গিয়ে নবী-রাসূলগণও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সেই তুলনায় আমরা তো কিছুই না। ‘বাল্লিগু আন্নি ওলাও আয়াহ’ অনুসারে আমাদের কাজ হবে সত্যটা তুলে ধরা, সেটা কারো পক্ষেও হতে পারে কিংবা কারো বিপক্ষে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলতে চাই, আমাদেরকে শত্রæ ভাববেন না। আমরা আপনাকে ভালোবাসি। ভাস্কর্য না বানিয়ে এমন কাজ করুন, যাতে আপনার মৃত্যুর পরও আপনাকে স্মরণ করতে পারি।  


মাওলানা আহমদ রশীদ, ইয়র্ক বাংলা

প্রথমেই এমন একটি মহতি উদ্যোগের জন্য আইটিভিকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। বাংলাদেশে যারা ভাস্কর্যের পক্ষে মাঠে নেমেছে, তারা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েই ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য নেমেছে। আশাকরি, আইটিভির এই আলোচনার মধ্য দিয়ে তাদের পক্ষ থেকে সৃষ্টি করা বিভ্রান্তি দূর হবে। একই সাথে এ নিয়ে আরো বেশি বেশি আলোচনা করার আহŸান জানাই। বাংলাদেশের আলেমদের প্রতি আমার অনুরোধ, প্রতিটি মাদরাসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মসজিদ এবং খানকায় এ নিয়ে আলোচনা করুন। আমরা প্রবাসী আলেমরাও এ নিয়ে একটা সংবাদ সম্মেলন ডেকে কথা বলতে পারি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি স্মারকলিপি দিতে পারি।


হাফেজ রফিকুল ইসলাম, মসজিদ মিশন সেন্টার 

মাওলানা মামুুনুল হক, আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ যারাই ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। আমি বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী নিজেও চান না দেশে কোনো ভাস্কর্য তৈরি হোক। কোনো দেশ কিংবা গোষ্ঠীর চাপে হয়তো তিনি চুপ করে আছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে বলতে চাই, আমরা আপনার সঙ্গে আছি। আপনার হাত ধরে কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি এসেছে, সুতরাং মূর্তির পক্ষে আপনার অবস্থান হতে পারে না। এটা আমরা বিশ্বাসও করতে চাই না। আপনার বাবার স্মৃতির উদ্দেশ্যে কিছু তৈরি করতে চাইলে উনার নামে মসজিদ বানান, মাদরাসা বানান, স্কুল বানান। কিন্তু মূর্তি বানাবেন না।


মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, আইটিভিইউএসএ

এই আলোচনায় যারা যুক্ত হয়েছেন আপনাদের প্রত্যেককে অশেষ ধন্যবাদ। অনুষ্ঠানে যা যা আলোচনা হলো তার লিখিত রূপ নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেটের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। গুরুত্বপূর্ণ এই অনুষ্ঠানটি আয়োজনের পেছনে অত্যন্ত পরিশ্রম করেছেন ইউনাইটেড ইমাম-ওলামা কাউন্সিলের সভাপতি মাওলানা রফিক আহমেদ রেফাহি। আল্লাহ যেন তার এই পরিশ্রমের প্রতিদান দেন, সেই দোয়া থাকলো


মাওলানা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মসজিদ আত তাওহীদ ফ্লোরিডা

ওলামায়ে কেরামরা মূর্তি কিংবা ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে আজ হঠাৎ করে বলছেন না। শত শত বছর ধরেই এটাকে হারাম বলা হচ্ছে। এতদিন কেউ এই ফতোয়ার বিরুদ্ধে কিছু বলেনি। আজ যখন বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ এলো, তখনই বিভিন্ন গোষ্ঠি এই ফতোয়ার বিরোধিতা করতে উঠেপড়ে লেগেছে। ইসলামের বিধান তো সবার জন্যই, সেটা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য হোক, কিংবা অন্য যে কারো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আপনার মন্ত্রী-এমপিরা আলেমদেরকে ঘাড় মটকে দেবার হুমকি দেয়, বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেবার হুংকার দেয়, এগুলো ঠিক নয়। তাদেরকে থামতে বলুন। দেশের ক্রান্তিকালে আলেমরাই এগিয়ে এসেছে, এসব চাটুকাররা নয়। 


মাওলানা মুহিবুর রহমান, মাদানি একাডেমি নিউইয়র্ক

বাংলা ভাষায় বহুল ব্যবহৃত একটি অভিধান হলো ‘সংসদ বাংলা অভিধান’। এই বইতে ভাস্কর্যের পরিচয় হিসেবে বলা হয়েছে-পাথর, মাটি, কাদা ইত্যাদি দিয়ে মূর্তি নির্মাণের শিল্প। এখানেওতো মূর্তি আর ভাস্কর্যকে প্রায় একই বলা হয়েছে। মেনে নিলাম, পার্থক্য আছে। কিন্তু তাতে তো আর শরীয়ত বদলে যাবে না। কোনোটা মূর্তি, কোনোটা ভাস্কর্য, কোনোটা প্রতীমা, কোনোটা স্ট্যাচু। যেটাই হোক না কেন, সেটা হারাম। শুনেছি, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাহাজ্জুদ পড়েন, হজ করেছেন। তাহলে তিনি কীভাবে এসব অনৈসলামিক কাজের অনুমতি দেন। দোয়া করি, তার যেন সুমতি হয়।

আপনার মতামত লিখুন :