• 777

মুক্তিযুদ্ধ ও আলেম মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান

মুক্তিযুদ্ধ ও আলেম মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান

১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। বাঙালী জাতির জীবনে সবচে বড় অর্জনের দিন। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর ২৩ বছরের নির্বিচার, শোষণ, নির্যাতনের কালো অধ্যায়ের প্রাচীর চিরে ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে মাজলুমানের রক্তে বিশ্ব মানচিত্রে অঙ্কিত হয় (৫৬ হাজার বর্গ মাইলের) নতুন এক দেশ। নাম তার বাংলাদেশ। এ অর্জন নয় কারো একার। বরং এ অর্জন আমার, আপনার, আমাদের সবার। এক্ষেত্রে কারো অবদানকে অস্বীকার করা মানে গোটা মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য, আমরা সকল শহিদের আত্মত্যাগকে মর্যাদা দিতে পারিনি, পারিনি মূল্যায়ন করতে। এমন সব বিচ্ছিন্ন কারণে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা জানবাজ আলেমদের মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকটাই অন্তরালে রেখে দিয়েছি।


আর এদিকে মুক্তিযুদ্ধে আলেমদের অবদান অন্তরালে থাকার কারণে অনেকেই মনে করেন স্বাধীনতা যুদ্ধে আলেমদের নেতিবাচক ভূমিকা ছিল। তাই দাড়ি টুপি দেখলেই স্বাধীনতা বিরোধী মনে করে। অথচ অনেক মুক্তিযোদ্ধা দাড়ি রাখতেন, নামাজ পড়তেন, এবং এখনও অনেক মুক্তিযোদ্ধা দাড়ি রাখেন, নামাজ পড়েন।


১৯৭১ সালে অধিকাংশ আলেম স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছেন। শহিদ হয়েছেন। নিজের রক্তে লিখেছেন প্রিয় মাতৃভূমির নাম।আবার অনেকে সরাসরি যুদ্ধ করেননি ঠিক; তবে লুকিয়ে লুকিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। মানুষকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করেছেন।  আজ আমরা এমনই কিছু আলেম মুক্তিযোদ্ধার জীবন পাতা ছুঁয়ে আসবো-


মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ: আব্দুর রশিদ ২৪৩ দিন আত্মগোপন থেকে স্বাধীনতার যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। তার পরামর্শে অসংখ্য মানুষ যুদ্ধে অংশ নেয়, এবং এই কারণে পাকিস্তানী হানাদাররা তার বাড়ি-ঘর সব জ্বালিয়ে দেয়।


মাওলানা আবুল হাসান যশোরী: তিনি ছিলেন যশোর রেল স্টেশন মাদরাসার মুহতামিম। তার মাদরাসার ছাত্ররা মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ৮ এপ্রিল তার মাদরাসায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হামলা করে ২১জন মুক্তিযোদ্ধাকে শহিদ করে; যাদের মধ্যে একজন ছিলেন প্রাজ্ঞ আলেম মাওলানা হাবীবুর রহমান এবং তার সাথে ছিলেন ৫ জন শাগরেদ আর বাকীরা ওখানে আশ্রয় নেয়া মুক্তিযোদ্ধা। পরে মাদরাসা প্রাঙ্গনেই শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবর দেয়া হয়। ওই হামলায় মাওলানা যাশোরী গুলিবিদ্ধ হয়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।


মাওলানা মুহাম্মদ কামরুজ্জামান চিশতী: পুরান ঢাকার জুরাইনের পীর হিসেবে তিনি পরিচিত। কথা সাহিত্যিক আনিসুল হকের “মা” উপন্যাসে আজাদের মা সফিয়া বেগম তার ছেলে আজাদকে এই পুরান ঢাকার জুরাইনের পীরের নির্দেশেই মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণ করেছিলেন। জুরাইনের পীরের বহু মুরীদ মুক্তিযোদ্ধা ছিল এবং জুরাইনের পীর সাহেব নিজে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিয়েছিলেন।


মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টা ঢাকার লালবাগ মাদরাসায় ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিয়েছিলেন। সে সময় কওমি মাদরাসার কয়েক জন ছাত্র হুজুরকে জিজ্ঞাস করেছিল, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আপনার কি অভিমত?

তিনি বলেন, এটা হচ্ছে জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের যুদ্ধ। পাকিস্তানিরা জালেম আর আমরা হচ্ছি মজলুম। হাফেজ্জি হুজুরের এই কথা শুনে অনেক আলেম দেশের টানে ও নির্যাতীত নারীদের পাকিস্তানী হানদার বাহিনীর লালসার হাত থেকে বাঁচাতে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েছিল। দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু নিজে হাফেজ্জি হুজুরের সাথে দেখা করে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন।


শায়খুল ইসলাম আমীমুল এহসান: তিনি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের প্রধান মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যা ও নারী ধর্ষণের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ইয়াহিয়া সরকার উনাকে জোর করে সৌদিআরব পাঠিয়ে দেয়। দেশ স্বাধীন হবার পর শায়খুল ইসলাম আমীমুল এহসান রহ. বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং বঙ্গবন্ধু তাকে ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদের প্রধান খতীব হিসাবে নিযুক্ত করেন।


ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম: ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের সবচেয়ে বড় কওমি মাদরাসা জামিয়া ইউনুসিয়া মাদরাসার মুহতামিম ছিলেন তিনি। তাকে মধ্যপ্রাচ্যের আলেমরা একনামে চিনতেন। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি ফতোয়া দেন। তার ফতোয়া শুনে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার অনেক বড় বড় আলেম মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন।

বহু মুক্তিযোদ্ধাকে ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রহ. তার নিজ বাসায় আশ্রয় দিয়েছেন। দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু উনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি চিঠিও দিয়েছিলেন। 


এর পাশাপাশি আরোকিছু আলেম মুক্তিযোদ্ধার নাম উল্লেখ না করলেই নয়। যেমন- মাও. আব্দুল হামিদ খান ভাসানী কুড়িগ্রাম, শহীদ বুদ্ধিজীবি মাও. অলিউর রহমান সিলেট, মাও. উবাইদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী সিলেট, মাও. আব্দুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী সিলেট, মাও. আব্দুর রহমান কুমিল্লা, মাও. আব্দুর রব কুমিল্লা, মাও. মুস্তাফিজুর রহমান নোয়াখালী, মুহাদ্দিস মাও. আব্দুস সোবহানপটিয়া, মুফতী আব্দুস সালাম চাটগামী চট্টগ্রাম, মাও. আবু ইসহাকচ ট্টগ্রাম, মাও. আবুল কালাম চট্টগ্রাম, মৌলভী আব্দুল মালেক চট্টগ্রাম, মৌলভী আব্দুস সুবহানচট্টগ্রাম, মাও. কাজী আবু ইউসুফ চট্টগ্রাম, মাও. দলিলুর রহমান চট্টগ্রাম, মাও. মতিউর রসূল চট্টগ্রাম, মৌলভী সৈয়দ আহমদ চট্টগ্রাম, আল্লামা দানেশ রহ.পটিয়া, মাও. হারুন ইসলামাবাদী পটিয়া, মাও. শরীফ পটিয়া, মাও. সিদ্দীকুল্লাহ পটিয়া, মাও. মুহাম্মাদ নো’মান চট্টগ্রাম, মৌলভী মকসুদ আহমদ ভুঁইয়া ফেনী, মাও. আব্দুল মতিন মজুমদার কুমিল্লা, মৌলভী নূরুল আফসার কুমিল্লা, মৌলভী মেসবাহুল ইসলাম মিঞা (নানু কারী) কুমিল্লা, মাও. আব্দুল মতিন কাজী কুমিল্লা, পীর কাশিমপুরী।


এছাড়া আছেন, মাও. আ. গফুর চিশতী কুমিল্লা, মাও. মতিউল ইসলাম না.গঞ্জ, মাও. মির্জা মুহাম্মাদ নূরুল হক কুড়িগ্রাম, মাও. আলিফুর রহমান রংপুর, ক্বারী আব্দুস সালাম সরকার রংপুর, মাও. মোহাম্মদ আলী রংপুর, মাও. মাহতাব উদ্দীন কুড়িগ্রাম, মাও. কামরুজ্জামান নরসিংদী, মাও. শামসুল হুদা কুড়িগ্রাম, মাও. আমজাদ হুসাইন কুড়িগ্রাম, আল্লামা বশিরুদ্দীন সাহেব দা. বা. নরসিংদী, মাও. বজলুর রহমান নরসিংদী, তাবলীগের আমীর মাও. মাহমুদুল হাসান ময়মনসিংহ, মৌলভী হাবীবুর রহমান (চানু) ময়মনসিংহ, মাও. কাজী আব্দুল হাই ময়মনসিংহ, হাফেজ  মহিউদ্দীন ময়মনসিংহ, শৈলাকান্দার পীর মাও. সাইফুল মালেক জামালপুর , মাও. ইউসুফ আলী খান বরিশাল, মাও. সৈয়দ মুহাম্মদ ইসহাক চরমোনাই, মৌলভী মির্জা আব্দুল হামীদ বরিশাল, মাও. মুখলিসুর রহমান কুমিল্লা, মাও. লোকমান আহমাদ আমীমী ঢাকা, মাও. আবুল হাসান যশোরী যশোর, নোয়াপাড়ার পীর খাজা রফিকুজ্জামান যশোর, মাও. হাবীবুর রহমান যশোর, মৌলভী নোয়াব আলী যশোর, মাও. আনোয়ারুল করীম যশোর, কালিয়ার হুজুর মাও. ফিরোজ আহমদ নড়াইল, মাও. উসমান গনী নোয়াখালী, সাংবাদিক মাও. আব্দুল আউয়াল চাঁদপুর, মাও. আতাউর রহমান খান কিশোরগঞ্জ, মৌলভী আজিম উদ্দীন ময়মনসিংহ।


এছাড়াও আছেন, মাও. ইরতাজ আলী কাশিমপুরী ময়মনসিংহ, জুরাইনের পীর আলহাজ্জ মাও. মুহাম্মদ কামরুজ্জামান চিশতী কুমিল্লা, মাও. মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর ঢাকা, আহমাদুল্লাহ আশরাফ ঢাকা, হাফেজ আহমাদ ঢাকা, মাও. ফজলুল হক নূর নগরী বি-বাড়িয়া, মাও. খাইরুল ইসলাম যশোরী ঝিনাইদহ, মাও. মুহিউদ্দীন খান ময়মনসিংহ, মাও. মুহিউদ্দীন শামী মুন্সিগঞ্জ, জমিয়ত নেতা ক্বারী আব্দুল খালেক বাগের হাট, মাও. শামসুদ্দীন কাসেমী চট্টগ্রাম, মাও. জহিরুল হক ভুঁইয়া বি-বাড়িয়া, মাও. ইসহাক ওবায়দী নোয়াখালী, মুফতী নূরুল্লাহ বি-বাড়িয়া, মাও. মোস্তফা আজাদ ফরিদপুর, মাও. রুহুল আমীন উজানবী চাঁদপুর, মাওলানা শওকত আলী শরীয়ত পুর, মাও. কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ যশোর, মাও. ইমদাদুল হক আড়াই হাজারী না.গঞ্জ. মাও. ফরিদ উদ্দীন মাসঊদ কিশোরগঞ্জ, মুফতী শামসুদ্দীন চাঁদপুর, মাও. আব্দুল হালীম হুসাইনী কিশোরগঞ্জ, মাও. মৌলভী মির্জা আহমদ বরিশাল, মাও. আকরাম খান, মৌলভী আতিকুল মাওলা, মাও. রাগেব আহসান, হাফেজ ক্বারী ইউসুফ, মাও. শামসুল হক কুড়িগ্রাম, মাও. কাজী ইয়াকূব আলী রাজবাড়ি, মাও. আ. মতিন চৌধুরী শায়খে ফুলবাড়ি সিলেট, জইমুল ক্বওম মাও. হাবীব উল্লাহ সিলেট, মাও. লুৎফুর রহমান শায়খে বর্ণভী সিলেট, শাইখুল হাদীস তজম্মুল আলী সিলেট, মুজাহিদে মিল্লাত মাও. আরিফ রব্বানী ময়মনসিংহ,  মাও. কাসিমুদ্দীন পাবনা, মাও. জেবুল হাসান পটিয়া, শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক মুন্সিগঞ্জ।


এ রকম আরো অনেক আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ রয়েছে যাদের অবদান বাংলার জমিনের প্রতিটি পরতে পরতে মিশে আছে । হয়ত ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম নেই, কিন্তু তাদের নাম রয়েছে ৫৬ হাজার বর্গ মাইলের ভাঁজে ভাঁজে।




জাতি হিসেবে আমাদের জন্য পরিতাপের বিষয় হচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক যত নিবন্ধ, প্রবন্ধ এবং বই প্রকাশিত হয়েছে, তাতে আলেমদের নেতিবাচক ভাবেই তুলে ধরা হয়েছে এবং হচ্ছে। বর্তমান প্রজন্ম এসব বই, নাটক, সিনেমা দেখে আলেমদের বা দাড়ি টুপি দেখলেই রাজাকার মনে করে। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হবে। এদেশের শত্রু-মিত্রদের চিনিয়ে দিতে হবে। সেজন্য মুক্তিযুদ্ধে আলেমদের যে বীরত্ব ও অবদান রয়েছে তা মাানুষের কাছে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে।


তথ্যসূত্র: আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে

আপনার মতামত লিখুন :